যাত্রা শুরু

দাক্ষিনাত্যে পদার্পন

ঊচ্চ মাধ্যমিক সায়েন্স্ নিয়ে পাশ করলাম, বড়াবড়ই engineering পড়বার সখ ছিল, কিন্তু জয়েন্টে পাবার মুরদ ছিল না৷ অগত্যা পিতা তার অপদার্থ সন্তান কে লইয়া দাক্ষিনাত্যে, সঠিক ভাবে বলতে গেলে, কর্নাটকে এলেন৷আমরা ঠিক করেছিলাম যে কোন donation বা capitation fees দেব না৷ তায় গেলাম ভাটকালে৷ একটা Muslim Minority College আছে সেখানে, আমরা খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য [এখন বুঝি ওটা সৌভাগ্য], রাজ্য সরকার আর ম্যানেজমেন্টের মধ্যে কিছু Quota গোলযোগ লেগেছিল, আর ফয়সালা হতে দেরি হচ্ছিল৷ আমরা সপ্তাহ খানেক ওখানেই ঘাঁটি গারলাম, কিন্তু তাও যখন কোন সুরাহা হল না, বাবা বললেন, চল্ ব্যাঙ্গালোর৷

আমার বাবা হচ্ছে স্ট্রীট স্মার্ট বলতে যা বোঝায় তায়৷ দারুন ভাল sportsman, সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন৷ আজ পর্যন্ত, শত চেষ্টা করেও আমি ইংরাজি গল্পের বই-এ বাবাকে হারাতে পারিনি৷বাংলার কথা না হয় নাই বললাম? আর বাবা হচ্ছে যাকে বলে dare devil৷ বাঙ্গলায় একটা কথা আছে, বাপ কা বেটা, সেপাই কা ঘোড়া, কুছ ভি নেহি তো থোরা থোরা৷ কিন্তু আমার সবথেকে বাজে শত্রুও বলতে পারবে না যে আমি এর একটাও৷ মাঝে মাঝে ভাবি, কেন যে আমি বাবার মত হলাম না? আমার মনে আছে, একবার বাবার সাথে হোস্টেলে যাচ্ছি, আমার হাতে একটা বেশ বড় স্যুটকেস৷ হাওড়া স্টেশন থেকে ১৮-বি ধরে খিদিরপুর যাব৷পেছনের দরজা দিয়ে ঊঠতে যাচ্ছি, মূর্তিমান কন্ডাক্টার কোথা থেকে হাজির৷ যমের মত পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলে, এত ভারি ব্যাগ নিয়ে ওঠা যাবে না৷ আমি আমতা-আমতা করে কিছু বলতে যাব, তার আগেই পেছন থেকে বাবার কন্ডাক্টারকে এক ধমক, “চুপ, গরু কোথাকার”৷ বলে নিজেই স্যুটকেস নিয়ে ঊঠে গেল৷ কন্ডাক্টার কেমন একটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে স্যুট করে কুট্টি মামার ভাষায় কাট-ডাউন৷

বাবার হাথ ধরে ব্যাঙ্গালোর

ব্যাঙ্গালোরের একটা নতুন কলেজের এক সেক্রেটারির সঙ্গে বাবার পরিচয় হয় তার আগের বছর, তখন আমি ক্লাস ইলেভেনে৷ লক্ষ্মীনারায়ণ এসেছিলেন গ্রেট ঈস্টার্নে নতুন কলেজের জন্য ছেলে যোগার করতে৷ আমার দুরদর্শী বাবা তখন তার সাথে দেখা করতে যায়, এবং লক্ষ্মীনারায়ণ বাবাকে বলেন যে পড়ের বছর উনি আমাকে consider করবেন৷তায় ওনার ভরসায় ব্যাঙ্গালোর চলে আসা গেল৷সে কি বাজে অবস্থা, ভাটকালে বিভত্স্য গরম আর ব্যাঙ্গালোরে ঠান্ডা৷ আমার জ্বর এসে গেল৷ ট্রেনে লোকশক্তি পার্টির [তখন রামকৃষ্ণ সবে পার্টি গঠন করেছে] এক ন্যাতার সাথে দেখা, কি যেন হেগড়ে৷বাবা প্রচন্ড আলাপি, কিছুক্ষণের মধ্যেই কথা, গল্প হতে লাগল, আমাদের কথা শুনে বলল, চিন্তার কোন কারন নেই, আমি বিনে পয়সায় হোস্টেলের ব্যবস্থা করে দেব, থাকার কোন খরচা লাগবে না৷ আমি আর বাবা মুচকি হাসলাম৷

ব্যাঙ্গালোর স্টেশনে নেমে চোখে ধাঁধা লেগে গেল৷ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, ছিম-ছাম৷ আর বেশ ঠান্ডা, একটা ভীষণ proffessional আবহাওয়া৷ আমরা আমাদের ট্রাস্ট অপিসে গিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণের সাথে দেখা করলাম৷ সবকিছু সেইদিনই হয়ে গেল৷ একটা পয়সা donation ছাড়াই আমার admisssion হয়ে গেল৷ আমি আজো বলব, সে দিন লক্ষ্মীনারায়ণ ভদ্রলোকের মত কাজ করেছিলেন৷ কথা মত, কোন donation ছাড়াই ভর্তি নিয়েছিলেন৷তারপর উনি নিজে গাড়ি করে আমাদের হোস্টেলে নিয়ে গেলেন, সেই বিখ্যাত ফিফ্থ হোস্টেল৷

এই ফিফ্থ হোস্টেল জুড়ে প্রচুর কিংবদন্তি আছে, এর আসেপাসেই Backbenchers নামক বিখ্যাত বাঙ্গলা ব্যান্ডের শুরু৷
(ক্রমশ প্রকাশ্য)