চাণক্যর জন্ম

তখন ধন নন্দ মগধের অধীশ্বর৷ পশ্চিমে বিপাসা নদির থেকে সুদূর পূর্বে কলিঙ্গ অব্দি ওনার বৃহৎ সাম্রাজ্য৷ বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারি ও আর্যাবর্তের সব চেয়ে শক্তিশালী রাজা কে পৃথ্বীবিজয়ি আলেক্সান্ডার অব্দি ভয় করত৷ তৎসত্ত্বেও মহারাজের মনে সুখ নেই৷ স্বভাবতই তিনি লোভি, নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী৷ প্রজাপ্রতিপালনের বদলে রাজ্যের সীমান্তবৃদ্ধিই মহারাজের ধ্যান জ্ঞ্যান৷ দেশের জনগণ ওনার অত্যাচারে অতিষ্ঠ৷ অমাত্যগন ওনাকে চাটুকথায় তুষ্ট রাখত, আর উচিত কথা যে বলত, তার ধর থেকে মাথা আলাদা হতে বেশী বিলম্ব হত না৷


তেমনই একজন অমাত্য ছিলেন রক্ষস৷ মহারাজ যে ক্রমশ মগধকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন, সেটা উনি বুঝেছিলেন৷ তাই মহারাজ যখন ঠিক করলেন যে উনি বৈশালি আক্রমন করবেন, রক্ষসের সঙ্গে ওনার মতানৈক হল৷ রাজশভায় মহারাজের বিরুদ্ধে এর আগে কেউ কথা বলে নি৷ মহারাজ ধননন্দ যত না রেগে গেলেন, অবাক হলেন আরো বেশি৷ অন্য কেউ হলে হয়ত বা শুলে দিতেন৷ কিন্তু না, উনি ঠিক করলেন এত সহজ শাস্তি তে চলবে না৷


মগধের রাজধানী পাটলিপুত্রের পুরপ্রাকারের বাইরে, উত্তর ভাগে ছিল এক মহাশ্মশান৷ রক্ষসকে সেইখানে নিয়ে যাওয়া হল৷ মাটি খুঁড়ে ওনাকে ওখানে পোঁতা হল৷ শুধু মাটির ওপর ওনার মুণ্ডুটি বেড়িয়ে রইল৷ অভিপ্রায় টা হচ্ছে রাত্রি কালে মহাশশ্মানের শিয়াল কুকুর রা ওনাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে৷ প্রতিশোধ টা বেশ নিগূঢ় হয়েছে মনে করে সেদিন মহারাজ বেশ তৃপ্ত হলেন৷


কিন্তু বিধির অন্য বিধান৷ এই বিপদের ক্ষণে ও রক্ষস মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করলেন৷ এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাবার কি উপায়? কিন্তু ভেবে কিছু কিনারা করতে পারলেন না৷ নানান কথা ভাবতে ভাবতে উনি হয়ত একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরেছিলেন৷ চমক ভেঙ্গে দেখলেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, ধুধু প্রান্তরে আঁধার ঘনিয়ে আসছে৷ জনমনুষ্যি কেউ কোথাও নেই৷ এদিকে গুটি গুটি পায়ে চারটে কদাকার শেয়াল ওনার মুন্ডুর চার পাশে ঘুর ঘুর করছে৷ ধমক দিলে খানিক দুরে যায়, কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে৷ সদন্ত বিকাশ করে আর ঘর ঘর বিশ্রী শব্দ করে৷ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত একটা বুদ্ধি ওনার মাথায় খেলে গেল৷ আছে, উপায় আছে, এই নরক থেকে উদ্ধার পাবার৷ উনি দম বন্ধ করে রইলেন৷ এদিকে শেয়ালগুলর পরিক্রমার গণ্ডি ক্রমশ ছোট হচ্ছে৷ মনুষ্যমুন্ড থেকে কোন স্বর নির্গত না হওয়ায় তাদের সাহস বৃদ্ধি পেয়েছে৷ এক দুঃসাহসিক শেয়াল রক্ষসের গালে বসিয়ে দিল এক কামড়৷ রক্ষস অমনি সজোরে তার কান কামড়ে ধরল৷ শেয়াল মশায় পরলেন মহা ফাঁপরে৷ সে তখন প্রাণপণে তার সামনের দুটো পা দিয়ে বেগে মাটি খুঁড়তে লাগল৷ এই ভাবে কিছুক্ষণ চলার পর দেখা গেল যে রক্ষসের দেহের উপরি ভাগ মাটির বাইরে চলে এসেছে৷


শ্মশান থেকে নির্গত হয়ে মগধে ওনার মন টিকল না৷ তাছাড়া সেখানে ধননন্দের চর সর্বত্র৷ এবার ধরা পরলে নিশ্চিত মৃত্যুর৷ তক্ষশিলা যাওয়া স্থির হল৷ সেখানে তিনি লোকালয় থেকে দুরে এক নির্জন স্থানে, লোকচক্ষুর আড়ালে, প্রতিশোধের নিষ্ফল আশায় দিন কাটাতে লাগলেন৷


একদিন সকালে, মেঠো পথ ধরে তিনি বাড়ি ফিরতে ফিরতে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সম্মুখীন হলেন৷ এক খর্ব, কুরূপ ব্রাহ্মণ পথের ধারে এক সরা গুড় নিয়ে ঘুরছে, আর শর গাছ দেখলেই ঝুঁকে পড়ে তার গোঁড়াতে খানিকটা করে গুড় লাগাচ্ছে৷ রক্ষস ভীষণ অবাক হলেন৷ ব্রাহ্মণকে প্রণাম করে তার এই কাজের অর্থ জিজ্ঞ্যেস করলেন৷ সে বলল যে সে এই পথ দিয়ে সকাল বিকাল যাবার সময় শর গাছের ধারাল পাতায় অনেক সময় তার পা ছড়ে যায়৷ তাই এই ব্যবস্থা৷ রক্ষস করজোড়ে বলল পণ্ডিত মশায়, ক্ষমা করুন কিন্তু আমি এখনো বুঝতে পারছি না শর গাছের গোঁড়ায় গুড় দিলে আপনার কাটা ঘায়ের কি ভাবে উপশম হবে?”৷ ব্রাহ্মণ হেসে ফেললে৷ বুঝলে না, এ অতি সরল৷ গুড়ের ঘ্রাণে পিঁপড়ের দল আসবে৷ আর তারা গাছের গোরা টিকে কুঁড়ে দেবে৷ তিন দিনের মধ্যে শর গাছটি শুকিয়ে যাবে৷রক্ষস এই তরুন ব্রাহ্মণের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলেন না৷ বাড়ি ফেরার পর ওনার কূটবুদ্ধির উদয় হল৷ ওনার নিজের বয়স হয়েছে৷ আজকাল বেশী পরিশ্রম ও করতে পারেন না৷ এই পরিস্থিতিতে মহারাজ ধননন্দর থেকে ওনার অপমানের শোধ নেওয়া ওনার পক্ষে অসম্ভব৷ কিন্তু যদি এই তরুণ ব্রাহ্মণ ওনার হয়ে প্রতিশোধ নেয়? হয়ত একটু কপটতার প্রয়োজন হবে৷ কিন্তু চেষ্টা করতে দোষ কি?


খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে গত কালের সেই ব্রাহ্মণ বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি বিদ্যার বিশারদ বিষ্ণু গুপ্ত৷ তাঁর কুট বুদ্ধির জন্য লোকে তাকে কৌটিল্য বলে ডাকে৷ রক্ষস ঠিক করলেন ব্রাহ্মণকে কোন ভাবে পাটলিপুত্রের রাজশভায় প্রেরণ করতে হবে৷


কিছু দিনের মধ্যেই সুযোগ এসে গেল৷ ধননন্দ তার পুত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে এক সহস্র ব্রাহ্মণ ভোজন করাবেন, তারপর প্রত্যেককে একশটি স্বর্ণ মুদ্রা উপহার দিয়ে বিদায় দেবেন৷


রক্ষস একটি লোককে কিছু পয়সা দিয়ে মগধের কপট দূত সাজাল৷ কপট দূতের হাতে জাল চিঠি দেওয়া হল যার মধ্যে বিষ্ণু গুপ্তকে পাটলিপুত্র ভোজসভায় আহ্বান করা হল৷ ব্রাহ্মণ এত ছল চাতুরী বুঝলেন না, সরল মনে, হৃষ্ট চিত্তে পাটলিপুত্রের দিকে রওয়ানা দিলেন৷


বিশাল ভোজ শভা, বিপুল আয়োজন৷ ঢালাও অন্ন ব্যঞ্জন মিষ্টান্ন৷ মহারাজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করছেন৷ বিষ্ণু গুপ্ত ভীষণ তৃপ্তি করে খেলেন ও মহারাজকে মনে মনে খুব আশীর্বাদ করলেন৷ বিদায় কালে সকলে মহারাজের নিকট নিজ নিজ পরিচয় দিচ্ছিলেন আর এক শত স্বর্ণ মুদ্রা নিয়ে পুলকিত হয়ে বিদায় নিচ্ছিলেন৷ যখন তক্ষশিলার বিষ্ণু গুপ্ত ধননন্দ কে নিজের পরিচয় দিলেন, ওনার সেই কদাকার রূপ দেখে মহারাজ হেসেই অস্থির৷ ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞ্যেস করলেন ওহে কুৎসিত ব্রাহ্মণ, তুমি এখানে কার আমন্ত্রণে এসেছ? ওরে কে আছিস, এটাকে টিকি ধরে আমার প্রাসাদ থেকে বাহির করে দে৷সমস্ত লোকের সামনে এই ভাবে অপমানিত হয়ে বিষ্ণু গুপ্ত রাগে কাঁপতে লাগলেন৷ তিনি সেই মুহুর্তে নিজের শিখা খুলে ফেললেন৷ প্রতিজ্ঞা করলেন যে নন্দের বিনাশ না করে তিনি শিখা বাঁধিবেন না৷


পরের গল্প অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত৷ বিষ্ণু গুপ্ত তক্ষশিলায় ফিরে গেলেন৷ অদূর ভবিষ্যতে তার সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত নামে এক তেজস্বী বালকের পরিচয় হল৷ সে এক অখ্যাতনামা নন্দবংশিয় রাজকুমারের জ্বারজ সন্তান৷ তাই সে রাজপুরী হতে বিতরিত৷ বিষ্ণু গুপ্ত তাকে নিজের শিষ্যত্বে গ্রহণ করিল৷


এই বিষ্ণু গুপ্তই পরে চাণক্য নামে ক্ষ্যাত হয়৷ বলাই বাহুল্য বিষ্ণু গুপ্ত পাঁচ বছরের মধ্যেই তার মহাপমানের পরিশোধ নিয়েছিল৷ তবে একটাই প্রশ্ন বার বার আমার মনে জাগে। রক্ষস না থাকলে কি অধ্যাপক বিষ্ণু গুপ্ত অর্থশাস্ত্রের বিখ্যাত লেখক চাণক্য হতে পারতেন? ঠিক জানি না৷